বিখ্যাত কবিদের কবিতা

রীফ–সর্দার

তোমারে আমরা ভুলেছি আজ,
​​ ​​ ​​​​ হে নবযুগের নেপোলিয়ন,
কোন সাগরের কোন সে পার
​​ ​​ ​​​​ নিবু-নিবু আজ তব জীবন।
​​​​
তোমার পরশে হল মলিন
​​ ​​ ​​​​ কোন সে দ্বীপের দীপালি-রাত,
বন্দিছে পদ সিন্ধুজল,
​​ ​​ ​​​​ ঊর্ধ্বে শ্বসিছে ঝঞ্ঝাবাত।
​​​​
তব অপমানে,​​ বন্দি-রাজ,
​​ ​​ ​​​​ লজ্জিত সারা নর-সমাজ,
কৃতঘ্নতা ও অবিশ্বাস
​​ ​​ ​​​​ আজি বীরত্বে হানিছে লাজ।
​​​​
মোরা জানি আর জানি জগৎ
​​ ​​ ​​​​ শত্রু তোমারে করেনি জয়,
পাপ অন্যায় কপট ছল
​​ ​​ ​​​​ হইয়াছে জয়ী,​​ শত্রু নয়!
​​​​
সম্মুখে রাখি মায়া-মৃগ
​​ ​​ ​​​​ পশ্চাৎ হতে হানে শায়ক –
বীর নহে তারা ঘৃণ্য ব্যাধ
​​ ​​ ​​​​ বর্বর তারা নর-ঘাতক।
​​​​
হে মরু-কেশরী আফ্রিকার!
​​ ​​ ​​​​ কেশরীর সাথে হয়নি রণ,
তোমারে বন্দি করেছে আজ
​​ ​​ ​​​​ সভ্য ব্যাধের ফাঁদ গোপন।
কামানের চাকা যথা অচল
​​ ​​ ​​​​ রৌপ্যের চাকি ঢালে সেথায়,
এরাই য়ুরোপি বীরের জাত
​​ ​​ ​​​​ শুনে লজ্জাও লজ্জা পায়!
​​​​
তুমি দেখাইলে,​​ আজও ধরায়
​​ ​​ ​​​​ শুধু খ্রিস্টের রাসভ নাই,
আজও আসে হেথা বীর মানব,
​​ ​​ ​​​​ ইবনে – করিম কামাল -ভাই।
​​​​
আজও আসে হেথা ইবনে-সৌদ,
​​ ​​ ​​​​ আমানুল্লাহ্​​ ,​​ পহ্‌লবী​​ ,
আজও আসে হেথা আলতরাশ​​ ,
​​ ​​ ​​​​ আসে সনৌসী – লাখ রবি।
​​​​
তুমি দেখাইলে,​​ পাহাড়ি গাঁয়
​​ ​​ ​​​​ থাকে নাকো শুধু পাহাড়ি মেষ,
পাহাড়েও হাসে তরুলতা
​​ ​​ ​​​​ পাহাড়ের মতো অটল দেশ।
​​​​
থাকে নাকো সেথা শুধু পাথর,
​​ ​​ ​​​​ সেথা থাকে বীর-শ্রেষ্ঠ নর,
সেথা বন্দরে বানিয়া নাই
​​ ​​ ​​​​ সেথা বন্দরে নাই বাঁদর!
​​​​
শির-দার তুমি ছিলে রীফের,
​​ ​​ ​​​​ পরনিকো শিরে শরিফি তাজ,
মামুলি সেনার সাথে সমান
​​ ​​ ​​​​ করেছ সেনানী,​​ কুচকাওয়াজ!
শুধু বীর নহ,​​ তুমি মানুষ,
​​ ​​ ​​​​ শাহি তখ্‌ত্ ছিল গিরি-পাষাণ,
রণভূমে ছিলে রণোন্মাদ,
​​ ​​ ​​​​ দেশে ছিলে দোস্ত্ মেহেরবান।
​​​​
রীফেতে যেদিন সভ্য ভূত
​​ ​​ ​​​​ নাচিতে লাগিল তাথই থই,
আশমান হতে রীফ-বাসীর
​​ ​​ ​​​​ শিরে ছড়াইল আগুন-খই,
​​​​
কচি বাচ্চারে নারীদেরে
​​ ​​ ​​​​ মারিল বক্ষে বিঁধে সঙিন,
যুদ্ধে আহত বন্দিরে
​​ ​​ ​​​​ খুন করে যার হাত রঙিন,
​​​​
হয়েছে বন্দি তাহারা যখন –
​​ ​​ ​​​​ (ওদের ভাষায় – হে ‘বর্বর’।)
করিয়াছ ক্ষমা তাহাদেরে,
​​ ​​ ​​​​ তাহাদের করে রেখেছ কর।
​​​​
ওগো বীর! বীর বন্দিদের,
​​ ​​ ​​​​ করনিকো তুমি অসম্মান,
তাদের নারী ও শিশুদেরে
​​ ​​ ​​​​ দিয়েছ ফিরায়ে – হয়নি প্রাণ।
​​​​
তুমি সভ্যতা-গর্বীদের
​​ ​​ ​​​​ মিটাওনি শুধু যুদ্ধ-সাধ,
তাদেরে শিখালে মানবতা,
​​ ​​ ​​​​ বীরও সে মানুষ,​​ নহে নিষাদ।
বীরেরে আমরা করি সালাম,
​​ ​​ ​​​​ শ্রদ্ধায় চুমি দস্ত্ দারাজ,
তোমারে স্মরিয়া কেন যেন
​​ ​​ ​​​​ কেবলই অশ্রু ঝরিছে আজ।
​​​​
তব পতনের কথা করুণ
​​ ​​ ​​​​ পড়িতেছে মনে একে একে,
তব মহত্ত্ব তুমি নিজে
​​ ​​ ​​​​ মানুষের বুকে গেলে লেখে।
​​​​
মাসতুতো ভাই চোরে চোরে –
​​ ​​ ​​​​ ফ্রান্স স্পেন করি আঁতাত
হয়ে লাঞ্ছিত বারংবার
​​ ​​ ​​​​ হায়ওয়ান সাথে মিলাল হাত।
​​​​
শয়তানি ছল ফেরেব-বাজ
​​ ​​ ​​​​ ভুলাল দেশদ্রোহীর মন,
অর্থ তাদের করিল জয়
​​ ​​ ​​​​ অস্ত্রে যাহারা জিনিল রণ।
​​​​
স্বদেশবাসীরে কহো ডাকে
​​ ​​ ​​​​ অশ্রু-সিক্ত নয়নে,​​ হায় –
‘ভাঙে নাই বাহু,​​ ভেঙেছে মন,
​​ ​​ ​​​​ বিদায় বন্ধু,​​ চির-বিদায়!’
​​​​
বলিলে, ‘স্বদেশ! রীফ-শরিফ!’
​​ ​​ ​​​​ পরানের চেয়ে প্রিয় আমার!
তুমি চেয়েছিলে মা আমায়,
​​ ​​ ​​​​ সন্তান তব চাহে না আর!
‘মাগো তোরে আমি ভালোবাসি,
​​ ​​ ​​​​ ভালোবাসি মা তারও চেয়ে –
মোর চেয়ে প্রিয় রীফ-বাসী
​​ ​​ ​​​​ তোর এ পাহাড়ি ছেলেমেয়ে!
​​​​
‘মাগো আজ তারা বোঝে যদি,
​​ ​​ ​​​​ করিতেছি ক্ষতি আমি তাদের,
আমি চলিলাম,​​ দেখিস তুই,
​​ ​​ ​​​​ তারা যেন হয় আজাদ ফের!’
​​​​
দেশবাসী-তরে,​​ মহাপ্রেমিক,
​​ ​​ ​​​​ আপনারে বলি দেলে তুমি,
ধন্য হইল বেড়ি-শিকল
​​ ​​ ​​​​ তোমার দস্ত্-পদ চুমি!
​​​​
আজিকে তোমায় বুকে ধরি
​​ ​​ ​​​​ ধন্য হইল সাগর-দ্বীপ,
ধন্য হইল কারা-প্রাচীর,
​​ ​​ ​​​​ ধন্য হইনু বদ-নসিব।
​​​​
কাঠ-মোল্লার মউলবির
​​ ​​ ​​​​ যুজদানে ইসলাম কয়েদ,
আজও ইসলাম আছে বেঁচে
​​ ​​ ​​​​ তোমাদেরই বরে,​​ মোজাদ্দেদ!
​​​​
বদ-কিসমত শুধু রীফের
​​ ​​ ​​​​ নহে বীর,​​ ইসলাম-জাহান
তোমারে স্মরিয়া কাঁদিছে আজ,
​​ ​​ ​​​​ নিখিল গাহিছে তোমার গান।
হে শাহানশাহ্ বন্দিদের!
​​ ​​ ​​​​ লাঞ্ছিত যুগে যুগাবতার!
তোমার পুণ্যে তীর্থ আজ
​​ ​​ ​​​​ হল গো কারার অন্ধকার!
​​​​
তোমার পুণ্যে ধন্য আজ
​​ ​​ ​​​​ মরু-আফ্রিকা মূর-আরব,
ধন্য হইল মুসলমান,
​​ ​​ ​​​​ অধীন বিশ্ব করে স্তব।
​​​​
জানি না আজিকে কোথা তুমি
​​ ​​ ​​​​ নয়ি দুনিয়ার মুসা তারিক !
আছে ‘দীন’,​​ নাই সিপা-সালার​​ ,
​​ ​​ ​​​​ আছে শাহি তখ্‌ত্,​​ নাই মালিক।
​​​​
মোরা যে ভুলেছি,​​ ভুলিয়ো বীর,
​​ ​​ ​​​​ নাই স্মরণের সে অধিকার,
কাঁদিছে কাফেলা কারবালায়,
​​ ​​ ​​​​ কে গাহিবে গান বন্দনার!
​​​​
আজিকে জীবন-‘ফোরাত’ -তীর
​​ ​​ ​​​​ এজিদের সেনা ঘিরিয়া ওই,
শিরে দুর্দিন-রবি প্রখর,
​​ ​​ ​​​​ পদতলে বালু ফোটায় খই।
​​​​
জয়নালসম মোরা সবাই
​​ ​​ ​​​​ শুইয়া বিমারি খিমার মাঝ,
আপশোশ করি কাঁদি শুধু,
​​ ​​ ​​​​ দুশমন করে লুটতরাজ!
আব্বাস-সম তুমি হে বীর
​​ ​​ ​​​​ গেন্ডুয়া খেলি অরি-শিরে
পঁহুছিলে একা ফোরাত-তীর,
​​ ​​ ​​​​ ভরিলে মশক প্রাণ-নীরে।
​​​​
তুমি এলে,​​ সাথে এল না দস্ত্,
​​ ​​ ​​​​ করিল শত্রু বাজু শহিদ,
তব হাত হতে আব-হায়াত
​​ ​​ ​​​​ লুটে নিল ইউরোপ-এজিদ।
​​​​
কাঁদিতেছি মোরা তাই শুধুই
​​ ​​ ​​​​ দুর্ভাগ্যের তীরে বসি,
আকাশে মোদের ওঠে কেবল
​​ ​​ ​​​​ মোহররমের লাল শশী!
​​​​
এরই মাঝে কভু হেরি স্বপন –
​​ ​​ ​​​​ ওই বুঝি আসে খুশির ঈদ,
শহিদ হতে তো পারি না কেউ –
​​ ​​ ​​​​ দেখি কে কোথায় হল শহিদ।
​​​​
ক্ষমিয়ো বন্ধু,​​ তব জাতের
​​ ​​ ​​​​ অক্ষমতার এ অপরাধ,
তোমারে দেখিয়া হাঁকি সালাত​​ ,
​​ ​​ ​​​​ ওগো মগ্‌রেবী ঈদের চাঁদ!
​​​​
এ গ্লানি লজ্জা পরাজয়ের
​​ ​​ ​​​​ নহে বীর,​​ নহে তব তরে!
তিলে তিলে মরে ভীরু য়ুরোপ
​​ ​​ ​​​​ তব সাথে তব কারা-ঘরে।
​​​​
বন্দি আজিকে নহ তুমি,
​​ ​​ ​​​​ বন্দি – দেশের অবিশ্বাস!
আসিছে ভাঙিয়া কারা-দুয়ার
​​ ​​ ​​​​ সর্বগ্রাসীর সর্বনাশ!

কবির আরো কবিতা পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও দেখুন
Close
Back to top button